Friday, May 20, 2011

মুসলিম জাতির বিপর্যয়ের কারণ- ৪

চার. মুনাফেকী
মুসলিম জাতীর মধ্যে মুনাফেকদের একটি বড় অংশ সব সময় বর্তমান থাকে, তারা নিজেদের মুসলিম নামে প্রকাশ করে কিন্তু কাজ করে ইসলামের বিরুদ্ধে। এদের কারণেই যুগে যুগে ইসলাম ও মুসলমানের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। এ সব সুযোগ সন্ধানী, নামধারী ও তথাকথিত মুসলিমরা সব সময় মুসলিমদের ক্ষতি করা ও তাদের মধ্যে বিবাধ, বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখতে আমরণ চেষ্টা চালায়। মুনাফেকরা সাধারণত ইসলাম ও ইসলামী ঐতিহ্যে বিশ্বাস না করেও মুসলিম সমাজে মুসলিম বেশ-ভূষা নিয়ে বসবাস করে এবং মুসলিমদের সাথে তারা বিবাহ সাদীসহ যাবতীয় কর্মে অংশ গ্রহণ করে। মুসলিমদের যাবতীয় সমস্যা ও দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত হয়ে তারা তা মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজে লাগায়। মুনাফেকরাই যুগে যুগে ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। একারণে আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিকৃষ্ট শাস্তি দেবেন বলে ঘোষণা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلۡمُنَٰفِقِينَ فِي ٱلدَّرۡكِ ٱلۡأَسۡفَلِ مِنَ ٱلنَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمۡ نَصِيرًا ١٤٥﴾

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও মুনাফেকদের থেকে উম্মতদের অধিক সতর্ক করেন।
فعن عمران بن حصين رضي الله عنهما : (مرفوعًا( إن أخوف ما أخاف عليكم بعدي : منافق عليم اللسان
যেমন ইমরান ইবনে হুছাইন রা. হতে হাদিস বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার পর আমি তোমাদের জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হল, মুনাফিক, ভাষাজ্ঞানের অধিকারী ।
ইমাম বুখারি ইবনে আবি মুলাইকা হতে মারফু হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ত্রিশ জন ছাহাবীকে দেখেছি, তারা সবাই নেফাককে সর্বাধিক ভয় করত ।
হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন, ইবনে আবি মুলাইকা যাদের পেয়েছেন, তারা হলেন, আয়েশা রা., তার বোন আসমা রা, উম্মে সালমা রা., আর চার আবদুল্লাহ রা. এবং আবু হুরাইরা রা... [ফতহুল বারী: ১/১১১]
আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ جَٰهِدِ ٱلۡكُفَّارَ وَٱلۡمُنَٰفِقِينَ وَٱغۡلُظۡ عَلَيۡهِمۡۚ وَمَأۡوَىٰهُمۡ جَهَنَّمُۖ وَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ ٧٣ ﴾
অর্থ, হে নবী, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের উপর কঠোর হও, আর তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম; আর তা কতইনা নিকৃষ্ট স্থান। [তাওবা, আয়াত: ৭৩]
পাঁচ: আল্লাহর রাহে জিহাদ ছেড়ে দেয়া
জিহাদ হল, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও মহান শৌর্যবীর্য। জিহাদই হল, দ্বীন প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপকরণ। দুনিয়াতে আল্লাহর শাসন প্রবর্তন করার পথে কিছু পার্থিব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, অসামাজিক রাজনীতি এবং সমগ্র মানব সমাজের পরিবেশ ইত্যাদির প্রত্যেকটিই ইসলামের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব বাধা অপসারণ করার জন্যে ইসলাম শক্তি প্রয়োগ করে। প্রতিটি মানুষের নিকটই ইসলামের বাণী পৌঁছানো এবং প্রত্যেকের পক্ষে ইসলামী বিধানকে যাচাই করে দেখার প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং এভাবে স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে মানুষের নিকট ইসলামের অমর বাণী পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টিই এ শক্তি প্রয়োগের লক্ষ্য। কৃত্রিম ইলাহদের বন্ধন থেকে উদ্ধার করে মানুষকে স্বাধীনভাবে ভাল-মন্দ যাচাই করার সুযোগদানের জন্য জিহাদ এক অত্যাবশ্যক উপায়।
মুসলিমরা যখন জিহাদ করা ছেড়ে দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও অপমান অপদস্থকে চাপিয়ে দেবে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمْ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلا لا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ.
আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রা. হতে বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যখন তোমরা ‘ঈনা নিয়ে বেচা-কেনা কর, গরুর লেজের সাথে লেগে থাক, ক্ষেত খামারের উপর সন্তুষ্টি থাক এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করা ছেড়ে দাও, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর অপমান ও লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবে। যতদিন পর্যন্ত তোমরা তোমাদের দ্বীনের দিকে ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তা দূর করবে না ।
একমাত্র যারা মুনাফেক অথবা প্রতিবন্ধী তারা ছাড়া আর কেউ জিহাদ করা হতে বিরত থাকতে পারে না। যেমন কা‘ব ইবন মালেক রা. হতে বর্ণিত, তিনি তাবুকের যুদ্ধ হতে বিরত থাকার পর বলেন,
]فَكُنْتُ إِذَا خَرَجْتُ فِي النَّاسِ بَعْدَ خُرُوجِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَطُفْتُ فِيهِمْ أَحْزَنَنِي أَنِّي لَا أَرَى إِلَّا رَجُلًا مَغْمُوصًا عَلَيْهِ النِّفَاقُ ، أَوْ رَجُلًا مِمَّنْ عَذَرَ اللَّهُ مِنْ الضُّعَفَاءِ[ . رواه البخاري ]4066[ ومسلم ]4973[
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে যাওয়ার পর আমি যখন রাস্তায় বের হতাম তখন রাস্তায় একমাত্র মার্কা মারা মুনাফেক অথবা অন্ধ খোঁড়া প্রতিবন্ধী লোক ছাড়া আর কাউকে দেখতাম না। [বুখারি: ৪০৬৬, মুসলিম: ৪৯৭৩]
মোটকথা, মুসলিমরা যখন আল্লাহর রাহে জিহাদ করা ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর দুশমনদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে দেবে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যি কথাই বলেছেন, কারণ বর্তমানে আমরা মুসলিমদের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করলে দেখতে পাই তারা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে সীমাহীন খেয়ালি-পনায় লিপ্ত, তারা শুধু খাচ্ছে, হারাম হালাল বেচে চলছে না, আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করা ছেড়ে দিচ্ছে ইত্যাদি। এর ফলাফল কি দাঁড়াচ্ছে!? এর ফলাফল হিসেবে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি!? আমরা দেখতে পাচ্ছি, সারা দুনিয়াতে আজ মুসলিমরা অপমান অপদস্থ। পৃথিবীর আনাচে কানাচে তারা নির্যাতিত তারা দুশমনদের উপর সাহায্য চায়! অথচ তারা জানে না, যতদিন পর্যন্ত তারা তাদের দ্বীনের প্রতি ফিরে না আসবে ততদিন পর্যন্ত তাদের সাহায্য করা হবে না তাদের থেকে অপমান দূর করা হবে না। যেমনটি পরম সত্যবাদী রাসূল বলেছেন। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : مَنْ لَمْ يَغْزُ ، أَوْ يُجَهِّزْ غَازِيًا ، أَوْ يَخْلُفْ غَازِيًا فِي أَهْلِهِ بِخَيْرٍ ، أَصَابَهُ اللَّهُ بِقَارِعَةٍ قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَة .
আবু উমামা রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, [যে আল্লাহর পথে জিহাদ করল না অথবা কোন যোদ্ধার সহযোগিতাও করল না অথবা কোন যোদ্ধা পরিবার পরিজনের লোকদের প্রতিনিধিত্বও করল না আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের পূর্বে তাদের কঠিন আকস্মিক আযাবে আক্রান্ত করাবে ।
জিহাদের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَا لَكُمۡ إِذَا قِيلَ لَكُمُ ٱنفِرُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱثَّاقَلۡتُمۡ إِلَى ٱلۡأَرۡضِۚ أَرَضِيتُم بِٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا مِنَ ٱلۡأٓخِرَةِۚ فَمَا مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا فِي ٱلۡأٓخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ ٣٨ إِلَّا تَنفِرُواْ يُعَذِّبۡكُمۡ عَذَابًا أَلِيمٗا وَيَسۡتَبۡدِلۡ قَوۡمًا غَيۡرَكُمۡ وَلَا تَضُرُّوهُ شَيۡ‍ٔٗاۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ٣٩ ﴾
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হল, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় (যুদ্ধে) বের হও, তখন তোমরা যমীনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়? তবে কি তোমরা আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার জীবনের ভোগ-সামগ্রী আখিরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
যদি তোমরা (যুদ্ধে) বের না হও, তিনি তোমাদের বেদনাদায়ক আযাব দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক কওমকে আনয়ন করবেন, আর তোমরা তাঁর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। [সূরা আত-তাওবাহ: ৩৮-৩৯]
আয়াতের ব্যখ্যায় কোন কোন মুফাসসির বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে জিহাদকে ছেড়ে দেয়ার কারণে যে আযাব বিষয়ে ভয় দেখান, তা শুধু আখেরোতের আযাব নয়। বরং তা হল দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানের আযাব। যারা জিহাদ হতে বিরত থাকবে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে অপমান, অপদস্থ করবে। আল্লাহ তাদের যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত করবে। আর এ সুযোগটি তাদের দুশমনরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, জিহাদে অংশ গ্রহণ করার কারণে তাদের ধন-সম্পদ ও জীবনের যে ক্ষতি হত, আল্লাহর আযাবের কারণে তারা তার চেয়ে আরো অধিক পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে...।
দুনিয়াতে এমন কোন উম্মত পাওয়া যাবে না, যারা জিহাদ করা ছেড়ে দিয়ে সম্মানের অধিকারী হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করলে যে কষ্ট বা কথিত সম্মান হারা হত, জিহাদ ছেড়ে দেয়ার কারণে তারা আরো বেশি অপমান, অপদস্থ হবে।
যারা দুনিয়ার ধন সম্পদের মোহে পড়ে জিহাদকে ছেড়ে দেয়, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلۡ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُكُمۡ وَإِخۡوَٰنُكُمۡ وَأَزۡوَٰجُكُمۡ وَعَشِيرَتُكُمۡ وَأَمۡوَٰلٌ ٱقۡتَرَفۡتُمُوهَا وَتِجَٰرَةٞ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَمَسَٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَآ أَحَبَّ إِلَيۡكُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٖ فِي سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَٰسِقِينَ ٢٤﴾
বল, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের যে ধরনের কাজে মুসলমাদের বিপর্যয় তা থেকে হেফাযত করুন। আমীন

0 comments:

Post a Comment